ব্লুটুথ কীভাবে কাজ করে? এটি কতটুকু নিরাপদ?

ব্লুটুথ

ব্লুটুথ

একদিন আমি গান শুনছিলাম। তো সেই সময় আমার বন্ধু পাশে বসে ছিল। সে আমাকে বলল, “বাহ! গান টা সুন্দর তো! গান টা আমাকে ব্লুটুথ করে দিয়ে দে।”
আমি অবাক হয়ে বললাম,”আমার গান তোকে কেন দিব? তোকে দিলে তো আমার কাছে আর থাকবে না! অন্য কোথাও থেকে সংগ্রহ কর।”
সে হাসতে হাসতে বলল,”আরে ভয় পাস না।ব্লুটুথের মাধ্যমে নিলে তোর কাছেও থাকবে আবার আমার কাছেও চলে আসবে।কোন সমস্যা হবে না।”
আমি আবার্‌ও বললাম,”আমার টাকা কাটবে নাতো?”
বন্ধু বলল,”না। ১ টাকাও কাটবে না।”
এরপর অবাক হয়ে দেখলাম,আসলেই তো এটা দারুন একটা জিনিস!

আমাদের প্রায় সবার্‌ই এমন ব্লুটুথ সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু, এর কাজ করার পদ্ধতি সম্পর্কে অনেকেই জানিনা। আসুন, আজ ব্লুটুথ সম্পর্কে আলোচনা করা যাকঃ

ব্লুটুথ কি?

ব্লুটুথ কি?

ব্লুটুথ হলো সল্প অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট দুরুত্বের মাঝে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য এক বিশেষ ধরণের প্রযুক্তি। ১৯৯৪ সালে RS-232 ডাটা কেবলের বিকল্প হিসেবে টেলিকম জায়েন্ট এরিকসন এটি তৈরী করেন। এই নেট্‌ওয়ার্কের সর্বোচ্য সীমা সাধারণত ১০০ মিটারের মধ্যে হয়ে থাকে। ব্লুটুথ ২.৪৫ গিগাহার্টজ-এ কাজ করে। যতগুলো ওয়্যারলেস প্রযুক্তি রয়েছে তার মধ্যে ব্লুটুথ অন্যতম। ব্লুটুথ ডিভাইস একটি ফোন বা কম্পিউটারের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে তারের পরিবর্তে রেডিও তরঙ্গ’র ব্যাবহৃত হয়। এই প্রযুক্তি আপনার সেল ফোন, ডিজিটাল ক্যামেরা, প্রিন্টার, পিসি এবং অন্যান্য গ্যাজেটগুলির- একসঙ্গে বেতার সংযোগ স্থাপন করে, যার ফলে আপনার কাজ গুলো অনেক সহজ হয়। উদাহরণ দেওয়া যাক, আপনার সেল ফোন কিংবা টেলিভিশন, বাতাসে ভেষে আসা ওয়্যারলেস সিগন্যালকে গ্রহন করে কার্জ সম্পাদন করে। এটাও ঠিক এভাবেই কাজ করে বাতাসে ভেষে আসা রেডিও তরঙ্গ কে কাজে লাগিয়ে।

যে সব ইলেক্ট্রনিক গেজেট গুলো ব্লুটুথ টেকনলজি তে কাজ করে, তাদের প্রত্যেকের মধ্যে একটি রেডিও অ্যান্টেনা লাগানো থাকে, যা সিগন্যাল ট্রান্সমিট এবং রিসিভ উভয়ই কাজ্‌ই  করতে পারে। এরা ক্রমাগত অন্য গ্যাজেট গুলোর সাথে ওয়্যারলেস সিগন্যালকে প্রেরন এবং গ্রহন করে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে। অনেক পুরোনো ডিভাইস আছে যেগুলোতে আগে থেকে ব্লুটুথ থাকে না।যেমন, (পুরাতন ল্যাপটপ বা ডেক্সটপ) এগুলোতে অ্যাডাপ্টারস বা ইউএসবি অ্যাডাপ্টার স্টিক লাগানোর প্রয়োজন পড়ে।

প্রকারভেদঃ সাধারণত তিন ধরণের ব্লুটুথ দেখতে পাঅওয়া যায়। প্রথম শ্রেণীর,দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শ্রেণীর ব্লুটুথ।
প্রথম শ্রেণির ব্লুটুথ হল সব চেয়ে শক্তিশালী। যা প্রায় ১০০ মিটার পর্যন্ত সিগন্যাল বিস্তার করতে পারে.
দ্বিতীয় শ্রেণীর ব্লুটুথ সাধারণত ১০ মিটারের দূরত্ব পর্যন্ত পৌছাতে পারে এবং কাজ করতে পারে।আমরা সাধারণত দ্বিতীয় শ্রেণীর ব্লুটুথ্‌ই সর্বাধিক ব্যবহার করে থাকি।
তৃতিয় শ্রেণীর ব্লুটুথ ১ মিটার দূরুত্ব পর্যন্ত পৌছাতে পারে। এটি খুব কম শক্তিশালী।

তবে উল্লেখ্য,  ব্লুটুথ-এর কার্যকরী পাল্লা হচ্ছে ১০ মিটার। তবে বিদ্যুৎ কোষের শক্তি বৃদ্ধি করে এর পাল্লা ১০০ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি করা যেতে পারে।

ব্লুটুথ কীভাবে কাজ করে?

ব্লুটুথ কীভাবে কাজ করে?

ব্লুটুথ সাধারণত মোবাইল,পিসি, এবং তারবিহীন হেডসেটের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য বেশি ব্যবহৃত হয়। ব্লুটুথ প্রযুক্তিতে কম ক্ষমতা বিশিষ্ট বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে তথ্য পাঠানো হয়। এই যোগাযোগ ব্যাবস্থায় ২.৪৫ গিগাহার্ট্‌জ (প্রকৃতপক্ষে ২.৪০২ থেকে ২.৪৮০ গিগাহার্ট্‌জ-এর মধ্যে)-এর কম্পাংক ব্যাবহৃত হয়। ব্লুটুথ প্রযুক্তি’তে  রেডিও তরঙ্গ ব্যান্ডে ৭৯ টি  আলাদা আলাদা ফ্রিকুয়েন্সি (চ্যানেল) ব্যবহার করে ডাটা আদান প্রদান করে থাকে।

শিল্প, বিজ্ঞান এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যাবহৃত যন্ত্রের জন্যও উক্ত কম্পাংকের সীমাটি নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। তাই,এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, এটা অন্যান্য তরঙ্গ নির্ভর যন্ত্রের কার্যক্রমে বাধার সৃষ্টি করে কিনা? আপনার ফোনের ব্লুটুথ গিয়ে কারো লাইফ সাপোর্ট মেশিনের সাথে গণ্ডগোল পাকাবে কি-না?
উত্তর হলো, “না”।
কারণ এর কর্তৃক প্রেরিত সিগন্যালের ক্ষমতা থাকে মাত্র ১ মিলিওয়াট, যেখানে সেল ফোন ৩ ওয়াট পর্যন্ত সিগন্যাল প্রেরণ করে।সুতরাং, আপনার ফোনে বা ডিভাইজে যে ট্রান্সমিটার লাগানো থাকে, তা অনেক কম শক্তিশালী হয়ে থাকে.যার ফলে এর সিগন্যাল এতোদূর বহন করে নিয়ে যাওয়ার মতো ক্ষমতা থাকেনা। এটাই ব্লুটুথের সবথেকে ভাল গুণ।

এরাএকসাথে ৭ টি বা ৮টি যন্ত্রের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। তবে প্রত্যেকটি যন্ত্রকে ১০ মিটার ব্যাসার্ধের একই বৃত্তের মধ্যে অবস্থিত হতে হবে। কারণ এটি প্রযুক্তি চারিদিকে সর্বোচ্চ ১০ মিটার পর্যন্ত ক্রিয়াশীল থাকতে পারে। তবে এই ডিভাইজ গুলো কখনোই একে অপরের কানেকশনে বাঁধা প্রদান করে না। কেনোনা প্রত্যেকে ৭৯ চ্যানেল থেকে আলাদা আলাদা ফিকুয়েন্সি ব্যবহার করে একে অপরের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে। তাছাড়া ব্লুটুথের ক্ষেত্রে, ট্রান্সমিটার প্রতি সেকেন্ডে ১৬০০ বার কম্পাঙ্ক পরিবর্তন করে। তাই,একসাথে কানেক্ট থাকা ডিভাইজ গুলো একই সাথে একই সময়ে একে অপরের সাথে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে।

ব্লুটুথ কতটুকু নিরাপদ?

ব্লুটুথ কতটুকু নিরাপদ?

ব্লুটুথ কতটুকু নিরাপদ?

ওয়্যারলেস প্রযুক্তি গুলো তারের মাধ্যমে যোগাযোগ থেকে কম সুরক্ষিত হয়ে হয়। তার বা ওয়্যার পযুক্তির নিরাপত্তা ভেদ করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য কাজ। সে তুলনাতে ওয়্যারলেস প্রযুক্তির নিরাপত্তা ব্যাবস্থা ভেদ করা যথেষ্ট সহজ।কেনোনা এতে সকল তথ্য ক্রমাগত খোলা বাতাসে ভেসে বেরায়। আপনার যদি যথেষ্ট ক্ষমতা সম্পন্ন সংকেত রিসিভার ডিভাইস থাকে,তাহলে আপনি খুব সহজেই সংকেত গ্রহণ করতে পারবেন। তবে ব্লুটুথ বিভিন্ন নিরাপত্তা মোড উপলব্ধ করেছে। এবং এর সিকিউরিটি নির্মাতা’রা এতে কিছু সিমাবদ্ধতা জুড়ে দিয়েছেন। এতে শুধু আপনার নির্দিষ্ট করা বিশ্বস্ত ডিভাইজ গুলো একে অপরের সাথে সম্পর্ক যুক্ত হতে পারবে।  অন্য কোন ডিভাইস ব্যবহারকারীর গ্যাজেটে একটি সংযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করে, তবে ব্যবহারকারী’কে এটি করার জন্য সিদ্ধান্ত নিতে হবে।  এই টেকনিককে Device-level security বলা হয়ে থাকে। আবার আপনি চাইলে, আপনার ব্লুটুথ ডিভাইজ গুলো কি করতে পারবে এবং কি করতে পারবে না তার উপরও নির্দিষ্ট করে দিতে পারেন, একে Service-level security বলা হয়ে থাকে।

তবে হ্যাকার’রা অবশ্যই অনেক বেশি বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন। বেশ কিছু হ্যাকিং মেথড আছে। যেমন,

  • Blue bugging যার মাধ্যমে হ্যাকার’রা  আপনার অজান্তেই আপনার ডিভাইজের উপর নিয়ন্ত্রন নিয়ে ফেলবে।
  • Blue jacking বা ব্লু অপহরণ এর মাধ্যমে হ্যাকার’রা ১০ ​​মিটার (৩২ ফুট) ব্যাসার্ধের মধ্যে অন্যান্য ব্লুটুথ ব্যবহারকারীদের কাছে মেসেজ পাঠাতে পারে। এতে একধরণের বিজনেস কার্ড পাঠানো হয়।এভাবে তারা আপনার উপর নিয়ন্ত্রন নিয়ে নিবে।বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মার্কেটিং এ ব্যবহার করা হয়।
  • Blue snarfing এর মাধ্যমে যে কারো ডিভাইজ থেকে ব্লুটুথ ব্যবহার করে যেকোনো তথ্য ডাউনলোড করে নেওয়া যায়।
  • Car Whisperer একধরণের সফ্টওয়্যার যার মাধ্যমে হ্যাকার যেকোন ব্লুটুথ ডিভাইসে অডিও পাঠাতে এবং অডিও গ্রহণ করতে পারেন।

এছাড়াও প্রতিনিয়ত আর্‌ও বিভিন্ন ধরণের অনেক হ্যাকিং পদ্ধতি বের হচ্ছে এবং প্রযুক্তি ব্যাবস্থা কে বাধাস্বরুপ করছে।

ব্লুটুথ এবং ওয়াইফাই প্রযুক্তির পার্শ চিত্রঃ

ব্লুটুথ এবং ওয়াইফাই প্রযুক্তির পার্শ চিত্রঃ

ওয়াইফাই-ব্লুটুথের অনূরূপ ওয়্যারলেস প্রযুক্তি।
W L A N এর পুরো নাম হচ্ছে, ওয়্যারলেস লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্ক। এ কে আমরা সাধারণত ওয়াইফাই বলে চিনি। অথবা বলা যায় ওয়্যারলেস লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্ক এর একটি অংশ হল ওয়াইফাই।মূলত ১৯৯১ সালে’র দিকে ওয়াইফাই  আবিষ্কৃত হয়।যদিও আবিষ্কারের পর তখন এটি ওয়াইফাই নামে পরিচিত ছিল না।

এটা মূলত স্বল্প ও নির্দিষ্ট দূরত্বে বিভিন্ন ডিভাইসের মধ্যে তারবিহীন সংযোগের প্রযুক্তি। আর ওয়াইফাই মূলত ইন্টেরনেট ভিত্তিক তারবিহীন নেট্‌ওয়ার্কের প্রযুক্তি।-সংজ্ঞা গত পার্থক্য এটিই।  ব্লুটুথ প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি ডিভাইজ আরেকটি ডিভাইজের সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কানেক্ট হতে পারে।অপরদিকে ওয়াইফাইকে অনেকবেশি রেঞ্জ এবং অনেক বেশি পরিমানে ডাটা আদান প্রদান করার ক্ষমতা দিয়ে ডিজাইন করা হয়েছে। ওয়াইফাই মূলত কম্পিউটার,মোবাইল এবং ইন্টারনেটের মধ্যে ডাটা আদান প্রদান করিয়ে থাকে. এছাড়া এই প্রযুক্তি অনেক বেশি রেঞ্জ নিয়ে কাজ করতে পারে। এই প্রযুক্তি ব্যবহারে অনেক বেশি পাওয়ার এবং প্রসারিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজন পড়ে।

ওয়াইফাই অ্যালাইয়েনসের নতুন সংযোগ হচ্ছে,ওয়াইফাই ডাইরেক্ট। এটি মূলত ব্লুটুথের বিকল্প। এটিতে ওয়াইফাই নেট্‌ওয়ার্ক,রাউটার,একসেস পয়েন্ট ইত্যাদির প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ এখানে পাশাপাশি, একাধিক ডিভাইসের মধ্যে যেমন টেলিভিশন,মোবাইল,পিসি প্রভৃতির মাঝে তারছাড়া বা ওয়ারলেস ভাবে তথ্য বা ডাটা আদান-প্রদান করা যাবে।
কার্যক্ষমতা,গতি ও রেঞ্জের দিক দিয়ে ওয়াইফাই ডাইরেক্ট-ব্লুটুথের নতুন ভার্সন Bluetooth 4.0 এর থেকে যথেষ্ট এগিয়ে রয়েছে।

পরিশিষ্টঃ

প্রকৃত অর্থে কিন্তু ব্লুটুথ এবং ওয়াইফাই একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী বা বিকল্প প্রযুক্তি না। বরং একে অপরের পরিপূরক্‌ই বটে।
আপনি কোন প্রযুক্তি টি ব্যবহার করবেন সেটা নিতান্তই নিজের ব্যাপার।প্রয়োজনে চায়লে আপনি উভই প্রযুক্তিই এক্‌ই সাথে ব্যবহার করতে পারেন।

সঙ্গে থাকার জন্য ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *