ড. মুহম্মাদ কুদরাত ই খুদা – তোমাকে স্মরণ করি হে মহান কৃতি

৩রা নভেম্বর ড. মুহম্মাদ কুদরাত ই খুদার মৃত্যুবার্ষিকী। নভেম্বর মাস এদেশের বিজ্ঞান কর্মীদের জন্য শোকাবহ।কারন এই মাসেই আমরা হারিয়েছি আব্দুল্লাহ আল মুতী, জগদীশ চন্দ্র বসু, আ মু জহুরুল হক সহ অনেককে যাঁরা ছিলেন বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার প্রবাদপুরুষ। আসুন আমরা তাঁদের কর্মময় জীবন ও অবদানকে স্মরণ করি।

উপমহাদেশের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও লেখক ড. মুহম্মাদ কুদরাত ই খুদা জন্মগ্রহণ করেন ১৯০০ সালের মে মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিরভুম জেলায় মারগ্রামে একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে।

শিক্ষা জীবনঃ

তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় মারগ্রামে মাধ্যমিক ইংরেজি বিদ্যালয়ে।পরবতির্তে তিনি উডবার্ন মাধ্যমিক ইংরেজি বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন।১৯১৮ সালে কলকাতা মাদ্রাসা থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।১৯২৪ সালে প্রেসিডেন্সী কলেজের M. Sc. ছাত্র হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। মেধার স্বীকৃতি স্বরুপ তাঁকে সোনার মেডেল প্রদান করা হয়। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নে উচ্চতর গবেষণার জন্য প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি লাভ করেন। ১৯২৯ সালে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে D. Sc. ডিগ্রী লাভ করেন।

কর্মজীবনঃ

ড. কুদরাত ই খুদা ১৯৩১ প্রেসিডেন্সী কলেজের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ১৯৩৬ সালেই তিনি রসায়ন বিভাগে বিভাগীয় প্রধান হন। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৪ পযর্ন্ত তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। ১৯৪৬ এ তিনি আবার প্রেসিডেন্সী কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে ফিরে আসেন। এসময় তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। দেশ বিভাগের পর তিনি পুবর্পাকিস্তানে চলে আসেন এবং সরকারি জনশিক্ষার প্রধান হিসেবে ১৯৪৯ সাল পযর্ন্ত কাজ করেন। ১৯৪৯ সালে তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা পদে উন্নীত হন। মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি ১৯৫২ থেকে ১৯৫৫ সাল পযর্ন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডেরও চেয়ারম্যান ছিলেন।

বাংলাদেশের জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরে অবস্থিত বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমীর তিনি প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক(১৯৭৩-৭৫)। তিনি বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষনা পরিষদ (BCSIR) এর প্রথম পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন (১৯৫৫-৬৬)। তাঁর নামে প্রতিষ্ঠান সংলগ্ন সড়কের নাম দেওয়া হয়েছে। তাঁর অনুমদনের ফলে চারুকলা ইনস্টিটিউট গঠিত হয়।

পুরস্কারঃ

তাঁর কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ পাকিস্তান সরকারের ‘তামঘা-ই-পাকিস্তান’ এবং ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’ পুরস্কার লাভ করেন।১৯৭৬ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি তে অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক এবং ১৯৮৪ সালে ‘স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার’ এ ভূষিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির ফেলো ছিলেন।

শিক্ষা কমিশন গঠনঃ

বাংলাদেশে শিক্ষা পুনবির্ন্যাস করার প্রথম পদক্ষেপ হল জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন যা কুদরত ই খুদা শিক্ষা কমিটি নামেই বহুল পরিচিত। স্বাধীনতা লাভের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ১৯৭২ সালে যাত্রা শুরু করে ১৯৭৪ সালের মে মাসে এই কমিশন রিপোর্ট পেশ করে। রিপোর্টের প্রথম অধায়ে শিক্ষাকে বলা হয়েছে ‘সামাজিক পরিবর্র্তনের হাতিয়ার’। তাঁর রিপোর্টে অষ্টম শ্রেণী পযর্ন্ত প্রাথমিক, দ্বাদশ শ্রেণী পযর্ন্ত মাধ্যমিক শিক্ষার প্রস্তাবনা করা হয়।

প্রকাশনাঃ

তিনি বিজ্ঞানের সরস কাহিনী, বিজ্ঞানের বিচিত্র কাহিনী, বিজ্ঞানের সূচনা, জৈব রসায়ন (৪ খন্ড), পুবর্পাকিস্তানে শিল্প সম্ভাবনা, পরমাণু পরিচিতি, বিজ্ঞানের পহেলা কথা নামের পুস্তক রচনা করেন। তাঁর আনুকুল্যে ১৯৬৩ সালে মাগাজিন ‘পুরগামী বিজ্ঞান’ এবং ১৯৭২ সালে ‘বিজ্ঞানের জয়জাত্রা’ প্রকাশিত হয় । ‘পবিত্র কুরআনের পুতকথা’ এবং ‘অঙ্গারী যাওয়ারা’ তাঁর লেখা ধমী র্য় গ্রন্থ ।

আবিষ্কারঃ

কুদরাত এ খুদার বিশেষজ্ঞতার বিষয় ছিল গাঠনিক জৈব রসায়ন। তিনি ফেলে দেওয়া চা পাতা থেকে ক্যাফিন নামে একটি ওষুধ প্রস্তুত করেন। জৈব রাসায়নিক উপাদান পৃথক করার অনেকগুলো প্রক্রিয়া তিনি ও তাঁর সহকর্মীবৃন্দ আবিষ্কার করেন এবং এবিষয়ে ১৮টি আবিষ্কার কৃতিস্বত্বভুক্ত (patented) করেন। পাটখড়ি থেকে পারটেক্স তাঁর উল্লেখযোগ্য আবিষ্কারের একটি। আখ ও খেজুরের রস থেকে মল্ট ও সির্কা, পাট ও পাটখড়ি থেকে রেয়ন ও কাগজ তাঁর অন্যতম আবিষ্কার। এছাড়া তিনি ভেষজ, পাট, লবন, মাটি, কয়লা ও খনিজ দ্রব্য নিয়ে গবেষণা করেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয় ভুমিকা পালন করেন, এবং বাংলাদেশের জাতীয়তা বিকাশে বিশেষ অবদান রাখেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৪ সাল থেকে “কুদরাত এ খুদা” বৃত্তি চালু করা হয়। জীববিজ্ঞান, কলা, সমাজিক বিজ্ঞান ও আইন অনুষদের সকল বিভাগে সম্মান শেষ বর্ষে সবোর্চ্চ নম্বর অর্জনকারীকে এই বৃত্তি প্রদান করা হয়।তাঁর নামে স্বর্ণপদক প্রবর্তিত হয়েছে।

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার অন্যতম পথিকৃত এই মহান বিজ্ঞানী ১৯৭৭ সালের ৩রা নভেম্বর ঢাকায় পরলোকগমন করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *