আল-খোয়ারিজমী- বীজগণিতের জনক (পর্ব-১)

ইসলাম শুধুমাত্র একটি ধর্ম নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান (complete code of life)। ইসলামের উত্স কুরআন ও হাদীসকে যতদিন মুসলিমরা আকঁড়ে ধরেছে , ততদিন তাদের মর্যাদা পৃথিবীর বুকে উজ্জল ছিলো। কুরআন ও হাদীসকে ভুলার সাথে সাথে তাদের মর্যাদা ও দাপটও হারিয়ে যেতে বসেছে। আজ তাদের মর্যাদা ভুলন্ঠিত। সেখানে ইহুদী,নাসারা,খ্রিস্টানরা এগিয়ে এসেছে। তাদের দাপটে আজ ইসলাম হারিয়ে যাওয়ার পথে। বর্তমানে কুরআন ও সহীহ হাদীসকে ছেড়ে দেয়ায় তারা আজ অত্যাচারিত, অবহেলিত। অথচ পাশ্চাত্যের এই জ্ঞান বিজ্ঞানের এই রূপের পিছনে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান। কিন্তু পরিতাপের বিষয় আমরা মুসলিম হিসেব দাবী করলেও মুসলিম বিজ্ঞানীদের পরিচয় জানি না। বীজগণিতের জনক আল-খোয়ারিজমী, রসায়নের জনক জাবির ইবনে হাইয়্যান,চিকিত্সা বিজ্ঞানের জনক ইবনে সীনা’র নাম আমরা ভুলতে বসেছি।
অথচ জ্ঞান চর্চ্চায় ইসলামের মতো উত্সাহ আর কোন ধর্মই দেয় নি। কুরআনের ৩৬ নম্বর সূরা ইয়াসিনের ২নং আয়াতে প্রজ্ঞাময় কুরআনের কসম খাওয়া হয়েছে। এছাড়া কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে কুরআনের কথা নিয়ে চিন্তা করার ও গবেষণা, এমনকি সত্যতার যাচাই করা হয়েছে। ইসলামে বিভিন্ন জায়গা সফর করে আল্লাহর নিদর্শন দেখার ও তা নিয়ে চিন্তা করার নির্দেশ এসেছে।
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ [٩٦:
অর্থ: পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।
এছাড়া আল্লাহ তাআলা জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য দুআ করতে বলেছেন এভাবে
وَقُل رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا [٢٠:١١٤]
অর্থ; হে আমার পালনকর্তা! আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দিন। (সূরা ত্বোয়া হা- আয়াত নং-১১৪)।]
হাদীসে প্রত্যেক নরনারীর জন্য জ্ঞান অর্জন করাকে ফরজ বলা হয়েছে।
হযরত আনাস (রা) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ইলম বা জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর নারীর জন্য ফারয। আর অপাত্রে মানুষকে ইলম শিক্ষা দেয়া শুকরের গলায় মণিমুক্তা বা সোনার হার পরাবার শামিল। (বুখারী,মুসলিম,ইবনে মাজাহ, মিশকাত তাহক্বীক আলবানী হা/২১৮, হাদীসটির সনদ যইফ হলেও শাহেদ হাদীস থাকায় হাদীসটিকে হাসান স্তরের বলা হয়েছে।
এছাড়া হাদীসে এসেছে, আল্লাহ যাকে চান দ্বীনের জ্ঞান দান করেন, এটা আল্লাহর নিয়ামত ।
পবিত্র কুরআনের প্রথম নাযিলকৃত সূরা আলাকের প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে।
আজ আমি মুসলিম বিজ্ঞানীদের অন্যতম আল খাওয়ারিজমী নিয়ে কিছু লিখব ইনশাআল্লাহ।
মুসলিম বিজ্ঞানীদের মধ্যে অত্যন্ত প্রসিদ্ধ একজন বিজ্ঞানীকে নিয়েই আমার এই লেখা। এ থেকে আমরা বুঝতে পারবো যে, মুসলিমরা জ্ঞান বিজ্ঞানে কতটা এগিয়ে ছিলো। খলিফা মামুনের রাজত্বকালো যে সকল বৈজ্ঞানিক বিজ্ঞান চর্চ্চায় উত্কর্ষতা লাভ করেন আল খাওয়াজিমী তাদের নেতৃত্বে ছিলেন। যদিও খলিফা মামুন মুতাজিলা মতবাদকে অগ্রাধিকার দিয়ে ইসলামের অনেক ক্ষতি সাধন করেন। মধ্যযুগীয় মুসলিম বিজ্ঞানীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন।
নাম পরিচয়: নাম আবু আব্দুল্লাহ মোহাম্মাদ। পুরো নাম আবু আবদুল্লাহ মোহাম্মদ ইবনে মুসা আল খাওয়ারিজমী।
জন্ম: সোভিয়েত রাশিয়ার আরব সাগরে পতিত আমু দরিয়ার নিকটে একটি দ্বীপের নিকটে অবস্থিত খোয়ারিজম নামক শহরে জন্মগ্রহণ করেন। এটি ছিলো পারস্যের অন্তর্গত খিভা প্রদেশে। আল খাওয়ারিজমী তাঁর বাল্যকাল ও কৈশোর সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। তবে আনুমানিক ৭৮০ খ্রিস্টাব্দে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
জীবন ইতিহাস: আল খোয়ারিজমী খলিফা আল মামুনের বায়াতুল হিকমাহ সংলগ্ন গ্রন্থাগারে গ্রন্থাগারিকে চাকুরী করতেন। খলিফা মামুনের মৃত্যুর পরও জীবিত ছিলেন এবং পরবর্তী খলিফা আল ওয়াতহিক এর শাসনকালের সাথেও সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি পাটীগণিত,বীজগণিত,ভূগোল, জ্যোতিবিজ্ঞান,জ্যামিতিতে প্রভৃত ভূমিকা রাখেন। তবে মূলত বীজগণিতের জন্যই তিনি সবচেয়ে আলোচিত হন। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ আত-তাবারী তার নাম দেন মুহাম্মাদ ইবনে মুসা আল খোয়ারিজমী আল কুতরুবুল্লী। আল কুতরুবুল্লী বিশেষণ এটাই নির্দেশ করে যে, তিনি সম্ভবত বাগদাদের নিকটবর্তী ক্ষুদ্র শহর কুতরুবুল হতে এসেছিলেন। আল-তাবারী তাকে মাজুসী’দের অন্তর্ভূক্ত করেছেন। এটা থেকে বুঝা যায় যে, তিনি হয়তোবা প্রাচীন জরথ্রুস্ট মতবাদের অনুসারী ছিলেন। কিন্তু তাঁর ‘আল জিবর ওয়াল মুকাবিলা’ বই থেকে জানা যায় যে, তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ মুসলিম। সুতরাং এথেকে বুঝা যায় যে, হয়তোবা তাঁর পূর্বপুরুষ বা সম্ভবত তিনিই কৈশোরে জরথ্রুস্ট মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন, পরে ইসলাম গ্রহণ করেন।
বিজ্ঞানের প্রতি আকর্ষণ: খলিফা মামুনের বিশাল লাইব্রেরীতে আল খাওয়ারিজমী চাকুরী গ্রহণ করেন। এখানেই সম্ভবত তিনি বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। অসীম ধৈর্য সহকারে অধ্যয়ন করে তিনি বিজ্ঞানের যাবতীয় বিষয়ের সঙ্গে পরিচিতি লাভ করেন।
আল-খাওয়ারিজমী’র অবদান: তিনি ছিলেন একজন জগতবিখ্যাত গণিতবিদ। তার সময়ের গণিতের জ্ঞানকে তিনি এক অভাবনীয় সমৃদ্ধতর পর্যায়ে নিয়ে তুলেন। একজন গণিতবিদ হওয়ার পাশাপাশি ছিলেন একজন উল্লেখযোগ্য জ্যোতির্বিদ। ভূগোল বিষয়ে তার প্রজ্ঞা উত্কর্ষতাকে ছাপিয়ে গিয়েছিলো।
তিনি ছিলেন বীজগণিত তথা এলজেবরার (Algebra) জনক। তিনি প্রথম তাঁর একটি বইয়ে এই এলজাবরার নাম উল্লেখ করেন। বইটির নাম হলো “আল-জাবর ওয়া-আল-মুকাবিলা”। তার বই নিয়ে নিবন্ধটির শেষ অংশে থাকবে।
তিনি বিজ্ঞান বিষয়ক বহু গ্রিক ও ভারতীয় গ্রন্থ আরবীতে অনুবাদ করেন।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার অবদান নিচে দেওয়া হলো:
পাটিগণিত-এর ক্ষেত্রে অবদান: পাটিগণিত বিষয়ে তিনি একটি বই রচনা করেন যা পরে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। খ্রিস্টীয় ৬ষ্ঠ শতকে হিন্দুগণিতবিদগণ দশমিক পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন।এই পদ্ধতিকে খোয়ারিজমীই প্রথম ইসলামী জগতে নিয়ে আসেন। তার রচিত The Book of Addition and Substraction According to the Hindu Calculation (যোগ বিয়োগের ভারতীয় পদ্ধতি) তারই উদাহরণ।
বীজগণিত-এর ক্ষেত্রে অবদান: এ ক্ষেত্রে তিনি সবচেয়ে বেশী উত্কর্ষতা লাভ করেন। তার হাতেই গণিতের এই শাখাটি পরবর্তী সময়ে আরও সমৃদ্ধতর হয়।বর্তমান যুগ পর্যন্ত গণিত বিদ্যায় যে উন্নয়ন এবং এর সহায়তায় বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় যে উন্নতি ও আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে তার মূলে রয়েছে আল-খোয়ারিজমী’র উদ্ভাবিত গণিত বিষয়ক নীতিমালারই বেশী অবদান।
তার রচিত বই “কিতাব আলজিবর ওয়াল মুকাবিলা’ হতে বীজগণিতের ইংরেজী নাম অ্যালজেবরা (Algebra) উত্পত্তি লাভ করে। Algorithm শব্দটি Alkhwarizmi নামের ল্যাটিন অপভ্রংশ algorismi হতে উত্পত্তি লাভ করেছে।
এলজাবরায় লিনিয়ার বা একঘাত এবং কোয়াড্রেটিক বা দ্বিঘাত সমীকরণ আছে।
আমরা সাধারণত কোন সমীকরণ সমাধান করে যখন x অথবা y-এর একটি করে মান পাই। যেগুলো এক ঘাত সমীকরণ নামে পরিচিত।আবার দ্বিঘাত সমীকরণে দুটি মান পাওয়া যায়।এই দুই ধরণের সমীকরণের বিশ্লেষণধর্মী ব্যাখা তুলে ধরেন আল-খাওয়ারিজমী।
যেমন X+1=0, এটি একটি একঘাত সমীকরণ যার একটি মান 1। আবার X2-5X+6=0 একটি দ্বিঘাত সমীকরণ যেখানে এর মান দুটি 3 অথবা 2।
তাঁর এলজাবরা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে গণিত জগতে এর উপযোগীতা অভাবনীয় বেড়ে যায়। মধ্যযুগের আর কোন গণিতবিদই গণিত জগতে তার সমান্তরাল কর্ম উপস্থাপন করে যেতে পারেননি।
তিনি গণিতের লগারিদম শাখাটিও তিনি উন্নয়ন করেন।

আগামী পর্বে শেষ হবে ইনশাআল্লাহ। পোস্ট বড় না করার জন্যই দুই পর্বে দিলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *